বিএমআর কী ?
বিএমআর কী
বেসাল মেটাবলিক রেট (BMR) হলো শরীরের সেই ন্যূনতম শক্তির চাহিদা, যা আমাদের দেহকে সম্পূর্ণ বিশ্রামরত অবস্থাতেও জীবিত ও সচল রাখতে প্রয়োজন হয়। আমরা যখন ঘুমিয়ে থাকি বা কোনো কাজ করি না, তখনও শরীরের ভেতরে অসংখ্য গুরুত্বপূর্ণ কাজ চলতে থাকে। যেমন—হৃৎপিণ্ড রক্ত পাম্প করছে, ফুসফুস শ্বাস-প্রশ্বাস চালাচ্ছে, মস্তিষ্ক ও স্নায়ুতন্ত্র সংকেত আদান-প্রদান করছে, কোষ তৈরি ও মেরামত হচ্ছে এবং শরীরের স্বাভাবিক তাপমাত্রা বজায় থাকছে। এই সব কার্যক্রম পরিচালনার জন্য যে পরিমাণ ক্যালরি প্রয়োজন হয়, সেটিই হলো বেসাল মেটাবলিক রেট (BMR)।
মানবদেহের মোট দৈনিক শক্তি ব্যয়ের (Total Daily Energy Expenditure বা TDEE) সবচেয়ে বড় অংশ আসে এই বিএমআর থেকে। সাধারণত দৈনিক মোট ক্যালরি ব্যয়ের প্রায় ৬০% থেকে ৭৫% পর্যন্ত শক্তি শুধু শরীরের মৌলিক কার্যক্রম চালাতেই ব্যয় হয়। এর বাইরে প্রায় ১০% শক্তি খরচ হয় খাবার হজম, শোষণ ও বিপাকে—যাকে বলা হয় Thermic Effect of Food (TEF)। আর বাকি ২০% থেকে ৩০% শক্তি ব্যয় হয় হাঁটা-চলা, কাজকর্ম, ব্যায়াম ও অন্যান্য শারীরিক কর্মকাণ্ডে।
গবেষণায় দেখা গেছে, সুস্থ প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষদের ক্ষেত্রে গড় বেসাল মেটাবলিক রেট (BMR) প্রতিদিন প্রায় ১,৬৯৬ ক্যালরি এবং নারীদের ক্ষেত্রে প্রায় ১,৪১০ ক্যালরি হয়ে থাকে। তবে এটি সবার জন্য এক নয়। বয়স, লিঙ্গ, উচ্চতা, ওজন, পেশির পরিমাণ, হরমোনের কার্যক্রম এবং জিনগত বৈশিষ্ট্যের ওপর ভিত্তি করে বিএমআর ভিন্ন হতে পারে। সাধারণত যাদের শরীরে পেশির পরিমাণ বেশি, তাদের বিএমআরও তুলনামূলক বেশি হয়, কারণ পেশি বিশ্রাম অবস্থাতেও বেশি শক্তি ব্যবহার করে।
বিএমআর নির্ণয় করার জন্য গবেষণাগারে অত্যন্ত নিয়ন্ত্রিত পরিবেশের প্রয়োজন হয়। পরীক্ষার সময় ব্যক্তিকে সম্পূর্ণ বিশ্রামরত, শান্ত ও জাগ্রত অবস্থায় থাকতে হয়। এছাড়া সাধারণত শেষ খাবার গ্রহণের ১২–১৪ ঘণ্টা পরে, অর্থাৎ উপবাস অবস্থায়, আরামদায়ক ও তাপমাত্রা-নিয়ন্ত্রিত কক্ষে এই পরীক্ষা করা হয়। কারণ খাবার গ্রহণ, ব্যায়াম বা মানসিক চাপ সাময়িকভাবে শরীরের বিপাকীয় হার বাড়িয়ে দিতে পারে।
তবে বাস্তবে সবার পক্ষে ল্যাবরেটরিতে গিয়ে বিএমআর পরীক্ষা করা সম্ভব হয় না। তাই বর্তমানে অনেকেই অনলাইন BMR ক্যালকুলেটরের সাহায্যে নিজেদের দৈনিক মৌলিক ক্যালরি চাহিদার একটি প্রাথমিক ধারণা নিয়ে থাকেন। সাধারণত বয়স, উচ্চতা, ওজন এবং লিঙ্গের তথ্যের ভিত্তিতে এসব ক্যালকুলেটর খুব সহজেই আনুমানিক বিএমআর হিসাব করে দেয়। যদিও এটি গবেষণাগারের পরীক্ষার মতো পুরোপুরি নির্ভুল নয়, তবুও ওজন নিয়ন্ত্রণ, খাদ্য পরিকল্পনা এবং দৈনিক ক্যালরি প্রয়োজন বুঝতে এটি বেশ কার্যকর ও সহজ একটি উপায়।
আপনি চাইলে আমাদের BMR Calculators ব্যবহার করে আপনার BMR এবং TDEE সম্পর্কে ধারণা নিতে পারেন ;
BMR গবেষণায় ব্যবহৃত তিনটি প্রধান সূত্র নিচে আলোচনা করা হলো:
১. মিফলিন-সেন্ট জিওর সমীকরণ (Mifflin-St Jeor Equation)
১৯৯০ সালে এম. ডি. মিফলিন এবং এস. টি. সেন্ট জিওর এই সূত্রটি প্রণয়ন করেন । আধুনিক প্রাপ্তবয়স্কদের (স্থূল এবং স্বাভাবিক ওজনের ব্যক্তি উভয় ক্ষেত্রেই) বিএমআর নির্ধারণে এটি সবচেয়ে সঠিক এবং নির্ভরযোগ্য সূত্র হিসেবে পুষ্টিবিদদের দ্বারা স্বীকৃত । এই সমীকরণটি নিম্নরূপ:
BMR
পুরুষ=(10×W)+(6.25×H)−(5×A)+5
BMR
নারী=(10×W)+(6.25×H)−(5×A)−161
(এখানে, W = ওজন কেজিতে, H = উচ্চতা সেন্টিমিটারে, এবং A = বয়স বছরে )
২. সংশোধিত হ্যারিস-বেনেডিক্ট সমীকরণ (Revised Harris-Benedict Equation)
১৯১৯ সালে মূল হ্যারিস-বেনেডিক্ট সমীকরণ প্রকাশিত হয় এবং পরবর্তীতে ১৯৮৪ সালে রোসা ও শিজগাল এর নির্ভুলতা বৃদ্ধির জন্য এটি সংশোধন করেন । সমীকরণটি নিম্নরূপ:
BMR
পুরুষ=88.362+(13.397×W)+(4.799×H)−(5.677×A)
BMR
নারী=447.593+(9.247×W)+(3.098×H)−(4.330×A)
(এখানে ওজন কেজিতে এবং উচ্চতা সেন্টিমিটারে পরিমাপ করতে হবে )
৩. ক্যাচ-ম্যাকআর্ডল সূত্র (Katch-McArdle Formula)
অন্যান্য সমীকরণগুলো থেকে এটি ভিন্ন, কারণ এটি ব্যক্তির মোট ওজনের পরিবর্তে চর্বিহীন পেশী ভরকে (Lean Body Mass) বিবেচনায় নেয় । যাদের বডি ফ্যাট পার্সেন্টেজ জানা আছে, তাদের জন্য এটি অত্যন্ত কার্যকর । সমীকরণটি নিম্নরূপ:
BMR=370+21.6×(1−F)×W
(এখানে, F = চর্বির হার বা বডি ফ্যাট পার্সেন্টেজ দশমিকে, এবং W = মোট ওজন কেজিতে )
বিএমআর থেকে মোট দৈনিক শক্তি ব্যয় (TDEE) নির্ণয়
কোনো ব্যক্তির কেবল বেঁচে থাকার বাইরেও দৈনন্দিন হাঁটাচলা, কাজ এবং শারীরিক পরিশ্রমের জন্য শক্তির প্রয়োজন হয় । বিএমআর-কে শারীরিক সক্রিয়তার গুণক বা ফিজিক্যাল অ্যাক্টিভিটি লেভেল (PAL) দিয়ে গুণ করে মোট দৈনিক শক্তি ব্যয় (TDEE) নির্ধারণ করা হয় ।
শারীরিক সক্রিয়তার বিভিন্ন স্তরের গুণকসমূহ নিচে টেবিল আকারে উপস্থাপন করা হলো:
সক্রিয়তার স্তর (Physical Activity Level) | জীবনযাত্রার বিবরণ | গুণক মান (PAL Multiplier) |
| অলস বা পরিশ্রমহীন (Sedentary) | কোনো শারীরিক ব্যায়াম নেই, অফিসে ডেস্কে বসে কাজ করা ব্যক্তি । | 1.2 |
| হালকা সক্রিয় (Lightly Active) | সপ্তাহে ১ থেকে ৩ দিন হালকা ব্যায়াম বা খেলাধুলা করেন । | 1.375 |
| মাঝারি সক্রিয় (Moderately Active) | সপ্তাহে ৩ থেকে ৫ দিন মাঝারি ধরনের ব্যায়াম বা শরীরচর্চা করেন । | 1.55 |
| অত্যন্ত সক্রিয় (Very Active) | সপ্তাহে ৬ থেকে ৭ দিন কঠোর পরিশ্রম বা ভারী ব্যায়াম করেন । | 1.725 |
| অতিরিক্ত সক্রিয় (Extra Active) | প্রতিদিন একাধিকবার কঠোর অনুশীলন বা অত্যন্ত শ্রমসাধ্য চাকরি (যেমন নির্মাণ কাজ বা ম্যারাথন দৌড়বিদ) । | 1.9 |
ক্রীড়াবিদদের ক্ষেত্রে তাদের নির্দিষ্ট খেলার তীব্রতা ও প্রশিক্ষণের মেয়াদের ওপর ভিত্তি করে বিএমআর-এর সাথে বিশেষ গুণক যুক্ত করে শক্তির চাহিদা নির্ধারণ করা হয় । নিচে ক্রীড়া-নির্দিষ্ট মেটাবলিক গুণকের একটি তালিকা দেওয়া হলো:
খেলার নাম | প্রস্তাবিত গুণক সীমা (BMR Multiplier) |
| ফুটবল (Soccer) | 1.5−1.8+ |
| অ্যাথলেটিক্স (Track & Field) | 1.5−2.0+ |
| ক্রস কান্ট্রি রানিং (Cross Country) | 2.0+ |
| আমেরিকান ফুটবল (Football) | 1.8−2.0+ |
| সাঁতার (Swimming) | 1.5−2.0+ |
| গলফ (Golf) | 1.2−1.5+ |
| বাস্কেটবল (Basketball) | 1.5−2.0+ |
| টেনিস (Tennis) | 1.2−1.8+ |
| সাইক্লিং (Cycling) | 1.5−2.0+ |
| কুস্তি (Wrestling) | 1.5−2.0+ |
| ভলিবল (Volleyball) | 1.5−1.8+ |
| বেসবল / সফটবল (Baseball / Softball) | 1.2−1.8+ |
| ওয়াটার পোলো (Water Polo) | 1.5−2.0+ |
| নৃত্য / চিয়ারলিডিং (Dance / Pep / Cheer) | 1.5−2.0+ |